[t4b-ticker]

রাজনীতিই মুক্তির পথ

লেখক:
প্রকাশ: May 3, 2022

আবুল ইসলাম শিকদার: মাথায় উপরে যদি চুল না থাকে তাহলে পায়ের তলায় ধন্বন্তরি চুল গজানোর তেল মালিশ করলে তো কোন ফল ফলবে না। তেলটি মালিশ করতে হবে মাথায়ই। কেউ আমার সাথে দ্বিমত করলেও করতে পারেন, কিন্তু আমি অত্যন্ত জোরের সাথে বলতে চাই দেশের রাজনীতিকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেশকে কোনদিনই জান্নাত বানানো সম্ভব নয়। কোন দেশের রাজনীতি কতটা নিয়মতান্ত্রিক, কতটা শিষ্টাচারের গুণে গুণান্বিত, তার উপরই নির্ভর করে ঐ সমাজের সুস্থতা, স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সৌজন্য ও সৌভ্রাতৃত্বের বিষয়টি। যারা রাজনীতিতে এহেন দুর্বৃত্তায়ন বজায় রেখে শুধু ফিতা কেটে দোয়া পড়ে দেশটাকে দৈবশক্তির হাতে সপে দিয়ে, স্বর্গ বানাতে চান তারা হয় জ্ঞান পাপী না হয় অন্ধেরও অধম।

সমাজের গঠন, এর ভেতরকার কার্যকারণ সম্পর্ক সম্বন্ধে খুব অল্প লোকেরই ধারণা আছে। এমনকি আমি খুব জোরের সাথে বলি, বহু তথাকথিত বিদ্বান, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, উকিল মোক্তার, সাংবাদিক, মাওলানা সাহেব এদের অনেকেরই সে ধারণা নেই। বিশেষ করে ইতিহাস এবং সমাজ পরিবর্তনের ধারা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা এবং মুর্খতা দেখে আহত না হয়ে পারা যায় না। এদের বিশ্লেষণ ক্ষমতার স্থুলতা দেখে অবাক হতে হয়। এরা বড় বড় ডিগ্রি নিয়েছে অথচ মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে যে বৃষ্টি হয়, তা-ও জানে না। এরা ফিলিস্তিনিদের উপর যারা অত্যাচার করছে তাদের ধ্বংসের জন্য কান্নাকাটি করে প্রার্থনা করে। এরা বুঝে না, ইহুদিদের শক্তির উৎস কোথায়। মাত্র ২ কোটি ইহুদি কিভাবে তাদের মেধাশক্তিকে স্বৈর শক্তিতে পরিণত করে সারা পৃথিবীকে তছনছ করে ফেলছে। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, এবং ব্যবসা বাণিজ্যের নব্বই ভাগ কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদেরকে প্রতিরোধ করতে হলে অনুরূপ বিপরীত শক্তি এবং মেধারই প্রয়োজন এই সরল অংকটি যারা না বোঝেন, তাদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবীটা কতটা হাস্যকর!

এতো গেল একটা উদাহরণ মাত্র। আজ প্রতিটা ক্ষেত্রেই আমাদের সমাজপতি, রাজনীতিবিদ, আমলা এবং অন্যান্য সামাজিক শক্তির মুর্খতা বেদনাদায়ক। এরা গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়ার দলে। এরা রাজশক্তির পায়রবি করে। জ্বি স্যার, হ্যাঁ স্যার দলভুক্ত।
এদের জীবনে সামান্য আরাম আয়েশের জন্য এরা দিনকে রাত বলতে এবং বাপের নাম ঘুরিয়ে বলতেও দ্বিধা করে না। যে-ই সমাজে এত সস্তা দরে মেধা বিক্রি হয়, বিদ্বান ভীরু কাপুরুষের মতো লেজ গুটিয়ে মাছের কাটা খাওয়ার জন্য মিউ মিউ করে সেদেশের শক্তি ভেতর থেকে একেবারে পঁচে গলে নষ্ট হয়ে যায়।

যে সব সমাজ আজ পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গণতন্ত্র, ন্যায় বিচার বিদ্যমান, যেখানে মানুষের দ্বারা মানুষের নিরাপত্তা বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত হয় না সেসব দেশ কিন্তু এমন বাটপারি, ভণ্ডতা, আর স্বৈরাচারের কাঁধে ভর করে এগিয়ে যায়নি। তারা নিয়মের জন্য রক্ত দিয়েছে, মানুষের স্বাতন্ত্র্যের জন্য সংগ্রাম করেছে, অধিকারের জন্য লড়াই করেছে। আমাদের মতো ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয়া দেশ পৃথিবীতে আর একটিও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

আমরা নেতা নির্বাচন করবো ব্যাংক লুটপাটকারী শিল্পপতিকে, শ্রমিকদের মজুরি না দিয়ে পুলিশ দিয়ে পেটানো নষ্ট বাটপার নব্য ধনীকে, জেলার সেরা তান্ডবকারীকে, উগ্র সাম্প্রদায়িক কোন ঘৃণিত ব্যক্তি বা তার জ্ঞাতি গোষ্ঠীকে, আর দেশকে বানাতে চাবো “স্বর্গাদপি গরীয়সী ” তাতো হয় নারে ভাই।

বুদ্ধিজীবী বিক্রি হচ্ছে সরকারের কাছে, আর সরকার বিক্রি হচ্ছে শিল্পপতিদের কাছে।সুতরাং যুক্তিবিদ্যার ফ্যালাসির মতো সরকার এবং বুদ্ধিজীবী উভয়েই শেষ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে শিল্পপতিদের কাছে। অথচ সরকার নিজেই কিন্তু তার ভ্রান্ত অর্থনৈতিক দর্শন দিয়ে এসব শিল্পপতির উত্থান ঘটিয়েছে। নিজের তৈরি রোবটই যখন বিজ্ঞানীকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, তখন বিজ্ঞানী পালাবার পথ পায় না। বর্তমান নষ্ট রাজনীতি দিয়ে দেশের এবং সমাজের চুড়ান্ত মঙ্গল এবং সকল শ্রেণি পেশার মানুষের কল্যাণ সাধন সম্ভব নয়। এটা কোন যাদুমন্ত্রের অলৌকিক বিষয় নয়, এইটুকু সাদা বুঝ না থাকলে আমি আপনার কূপমন্ডুকতার প্রতি অসহিষ্ণু হলে দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

অদৃষ্টবাদিতা আগে ছিল কতিপয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন তা ধনী, নির্ধন, শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাইকে সমানভাবে স্পর্শ করেছে। একটা সমাজ শুধু ক্রমাগত এগিয়ে যায় না, মাঝে মাঝে তা পিছিয়েও যায়। স্কুল কলেজের হেড মাস্টার আর অধ্যক্ষ সাহেবরা যখন বক্তৃতা দেন মনে হয় তার সমস্তটাই তিনি ধর্ম ক্লাস নিচ্ছেন। আসলে ওর বাইরে তিনি কিছু জানেন বলেও মনে হয় না। পাঁচ দশক আগে একজন অধ্যক্ষের বক্তৃতার কত ডাইমেনশন, কত দিকে দিকে তার জ্ঞান রশ্মির বিচ্ছুরণ ছিল ভাবা যায় না। তিনি হয়তো বা ছিলেন, ফিজিক্সের কিংবা হিসাব বিজ্ঞানের মানুষ। কিন্তু কী আশ্চর্য, শেলি কীটস, বাইরন, টলস্টয়, রবীন্দ্রনাথ গোরকি, তার নখদর্পনে। অবিরাম ডায়ালোগ বলে যাচ্ছেন, “ম্যাকবেথ “থেকে, কিংবা মনপ্রাণ উজার করে আবৃত্তি করছেন রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের “স্বপ্নভঙ্গ ” থেকে। সেই অধ্যক্ষ মোটাদাগে এখন আর নেই। আহা কি স্বপ্নজাল বুনে যেতেন কথার যাদুতে। এখনকার অধ্যক্ষ যখন বক্তৃতা দেন, তখন তার জ্ঞান গরিমা দেখে লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকি। একজন অধ্যক্ষ একবার বললেন, হিটলার নাকি পাকিস্তানের সৈন্যদলের মতো সাহসী সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকলাম। আমার ভাবতে আরো লজ্জা হয়, আমি তার অধীনে ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলাম।

একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ কখনোই ভালো মানুষ হতে পারে না। আজ দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সামাজিক ভাবে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টিকারী শক্তিই সমাজের মাথায় বসে আছে। কথায় কথায় তারা আঘাত প্রাপ্ত হয়। প্রতিবেশী দেশেও আজ সাম্প্রদায়িকতার চরম নাচন শুরু হয়েছে। তাঁদের সংবিধান হচ্ছে ভুলুন্ঠিত। দুই দেশ যেন পাল্লা করে আজ ধার্মিক হতে যাচ্ছে। পাল্লা করে মানুষের জীবনকে বিষময় করে তুলছে। সুবিধাবাদীরা চুপ করে বসে আছে। তারা ঝড় থেমে গেলে মাথা তুলবে। না, চোখ বন্ধ করে থাকার উপায় নেই। বিবি তালাকের ফতোয়ার চেয়ে বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গণে টিকে থাকার এবং সবাইকে নিয়ে ভালো করে টিকে থাকার কৌশল আবিস্কার করাটা আজকে বেশি জরুরি। বিবিদের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য প্রচুর সময় পাওয়া যাবে। এখন আপনি যদি বলেন বিবির বিষয়ে হেস্তনেস্ত না করে ” আমি যুদ্ধেই যামু না ” তাহলে সে কথা আলাদা।

যাহোক দেশের ভালো চাইলে আমাদের ক্রমশ জ্ঞান নির্ভর সমাজের দিকে অগ্রসর হতে হবে। যার যেখানে শোভন অবস্থান তাঁকে সেখানে যাওয়ার পথটা ছেড়ে দিতে হবে। একটা পরিবার পরিচালনায় কত দূরদর্শিতা প্রয়োজন, সেখানে একটা দেশ পরিচালনায় যদি টাউট, বাটপার, চাঁদাবাজ, মাস্তান অদি বদিরাই নেতৃত্ব দেয় তাহলে দেশের যা হবার তা-ই হবে। কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হবে। সুস্থ ধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই। উন্নয়নের নামে ধোঁকাবাজি আর গলাবাজির অসারতা দেশে দেশে প্রমাণিত হতে শুরু করেছে।

আমরা যতদূর চলে এসেছি সেখান থেকে মূলে ফিরে যাওয়া বাস্তবিক পক্ষেই কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। একমাত্র সুস্থ এবং সুষ্ঠু ধারার রাজনীতিই পারে স্রোতের মুখকে ঘুরিয়ে দিতে।